ব্রিটিশশাসিত ভারতের অখণ্ড বঙ্গভূমির বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ২৪ মে (১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ বঙ্গাব্দ) কাজী ফকির আহমেদ ও জাহেদা খাতুনের ঘর আলো করে জন্মগ্রহণ করেন চির-বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। কাজী নজরুল শুধু বিদ্রোহী কবি নন; তিনি প্রেমের কবি, মানবতার কবি, সাম্যের কবি, সর্বোপরি তিনি ছিলেন সঙ্গীতস্রষ্টা। দরিদ্র পরিবারে চার পুত্রের অকালমৃত্যুর পর জন্ম নেওয়া দুখু মিয়া শৈশব থেকেই দুঃখ-দারিদ্র্যকে নিত্যসঙ্গী করে বড় হয়েছেন। কবির পূর্বপুরুষেরা এসেছিলেন পাটনা থেকে, চুরুলিয়ার আদালতে বিচারক বা কাজীরূপে। প্রভূত সম্মান ও প্রচুর বিষয়-সম্পত্তি ছিল তাঁদের; কিন্তু নজরুলের জন্মের অনেক আগেই সেসব সুখের দিন ফুরিয়ে যায়। মাত্র আট বছর বয়সে নজরুলের পিতা মারা যান। শৈশব-কৈশোরে চরম দারিদ্র্যের মুখোমুখি হয়ে লেটো দলের বাদক, রেল গার্ডের খানসামা, রুটির দোকানের শ্রমিক থেকে শুরু করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সৈনিক হিসেবে যোগদান—নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে তাঁর সংগ্রামমুখর জীবন। সাংবাদিকতা, রাজনীতির রাজপথ, কারাবরণ ও ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে স্ফুলিঙ্গ ছড়ানোর পাশাপাশি তিনি রচনা করেছেন অগণিত কাব্য, গান ও সাহিত্য। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে তিনি তাঁর সাহিত্য ও কবিতার মাধ্যমে তরুণ সমাজকে জাগিয়ে তুলেছিলেন। তিনি ধর্ম, বর্ণ বা গোত্রভেদের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষে মানুষে সাম্য প্রচার করেছেন। কাজী নজরুল ইসলামকে শুধু একজন কবি হিসেবে স্মরণ নয়, আমাদের রাজনৈতিক ও মানবিক চেতনার পুনরাবিষ্কারের ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাম্য, গণতন্ত্র, অন্তর্ভুক্তি ও প্রতিরোধের যে স্বপ্ন নজরুল দেখেছিলেন, আজকের সময়েও তা গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। বিশেষ করে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অগ্নিঘাঁটি মাদারিপুর অঞ্চল, এখানকার সশস্ত্র বিপ্লবী নেতৃত্ব ও গণমানুষের সাথে কবির যে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক সাঁকো গড়ে উঠেছিল, তা বাংলা সাহিত্য ও মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়।
শাহ মাদার-এর পুণ্যভূমি, মহাকবি আলাওলের জন্মভূমি থেকে বিপ্লবের তীর্থভূমি ঔপনিবেশিক ব্রিটিশশাসনবিরোধী সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামে মাদারিপুরের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত বীরত্বপূর্ণ। উনিশ শতকের শুরুতে হাজী শরীয়তুল্লাহ (১৭৮১-১৮৪০)-র নেতৃত্বে শুরু হওয়া ফরায়েজী আন্দোলনের মাধ্যমে বৃহত্তর ভারতীয় উপমহাদেশ তথা তৎকালীন বঙ্গ ও আসামের প্রজা ও কৃষকসমাজ শোষক জমিদার ও নীলকরদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়। তাঁর পুত্র মুহসীনউদ্দীন দুদু মিয়া (১৮১৯-১৮৬২)-র নেতৃত্বে এই আন্দোলন রূপ নেয় সরাসরি ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র ও রাজনৈতিক প্রতিরোধ সংগ্রামে। পরবর্তীতে বিশ শতকের সূচনালগ্নে ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে বিপ্লবী পূর্ণচন্দ্র দাস (১৮৮৯-১৯৫৬)-র নেতৃত্বে গড়ে ওঠে 'মাদারিপুর সমিতি' এবং তাঁরই অনুগামী তরুণদের নিয়ে গঠিত 'শান্তিসেনা' বাহিনী ব্রিটিশ শাসনযন্ত্রের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে উড়িষ্যার বুড়িবালামের তীরে বাঘা যতীন (১৮৭৯-১৯১৫)-র নেতৃত্বে পরিচালিত ঐতিহাসিক বালেশ্বর ট্রেঞ্চ যুদ্ধে আত্মাহুতি দেওয়া ও বীরত্ব দেখানো চার তরুণের—চিত্তপ্রিয় রায়চৌধুরী (১৮৯৪-১৯১৫), মনোরঞ্জন সেনগুপ্ত (১৮৯৮-১৯১৫) ও নীরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত (১৮৯২-১৯১৫)—তিনজনই ছিলেন মাদারিপুরের সন্তান। ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে মাস্টারদা সূর্য সেন (১৮৯৪-১৯৩৪)-র নেতৃত্বে ঐতিহাসিক চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার আক্রমণে অংশগ্রহণকারী মাদারিপুর শান্তিসেনা বাহিনীর বিপ্লবী মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য (১৯০৯-১৯৩২)-র ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে চরমুগুরিয়া মেল-ব্যাগ ডাকাতি মামলায় ফাঁসি হয় আর যাবজ্জীবন দীপান্তরের সাজা হয় সুরেন্দ্রমোহন করের। মাদারিপুরের বীর তরুণদের এই নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ, গোপন সশস্ত্র প্রতিরোধ ও অদম্য সাহসিকতার কারণেই মুক্তিকামী বিপ্লবীরা এই অঞ্চলকে পরম শ্রদ্ধায় 'চিতোর অব বেঙ্গল' আখ্যা দিয়েছিলেন। মাদারিপুরে বারবার এসেছেন ভারতবর্ষের স্বনামধন্য নেতা-নেত্রীরা। অসহযোগ আন্দোলন উপলক্ষে মাদারিপুরে এসেছেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ (১৮৭০-১৯২৫), দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত (১৮৮৫-১৯৩৩), নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু (১৮৯৭-১৯৪৫), মহাত্মা গান্ধী (১৮৬৯-১৯৪৮), সরোজিনী নাইডু (১৮৭৯-১৯৪৯), বাসন্তী দেবী (১৮৮০-১৯৭৪) প্রমুখ। এসেছেন শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক (১৮৭৩-১৯৬২) ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী (১৮৯২-১৯৬৩)। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (১৯২০-১৯৭৫)-র শৈশব-কৈশোরের বেশ কিছু সময় কেটেছে মাদারিপুরে; এখানে থাকাকালীন তিনি পূর্ণচন্দ্র দাসের আদর্শ দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হন, বস্তুত এখানেই তাঁর রাজনীতির হাতেখড়ি। 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী'তে তিনি স্মৃতিচারণ করেছেন: ‘১৯৩৬ সালে আব্বা মাদারীপুর মহকুমায় সেরেস্তাদার হয়ে বদলি হয়ে যান। আমার অসুস্থতার জন্য মাকেও সেখানে নিয়ে আসেন। ১৯৩৬ সালে আবার আমার চক্ষু খারাপ হয়ে পড়ে। ........ এই সময় আমি মাদারীপুর হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছিলাম লেখাপড়া করার জন্য।...... চোখের চিকিৎসার পর মাদারীপুরে ফিরে এলাম, কোন কাজ নেই। লেখাপড়া নেই, খেলাধুলা নেই, শুধু একটা মাত্র কাজ, বিকালে সভায় যাওয়া। তখন স্বদেশী আন্দোলনের যুগ। মাদারীপুরের পূর্ণ দাস তখন ইংরেজের আতঙ্ক। ............ ইংরেজদের বিরুদ্ধেও আমার মনে বিরূপ ধারণা সৃষ্টি হল। ইংরেজদের এদেশে থাকার অধিকার নাই। স্বাধীনতা আনতে হবে।’ এ মাটিতেই বেড়ে উঠেছেন নিখিল ভারত কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি (১৯১৬) অম্বিকা চরণ মজুমদার (১৮৫১-১৯২২), ঢাকা অনুশীলন সমিতির প্রধান পুলিনবিহারী দাস (১৮৭৭-১৯৪৯), আচার্য স্বামী প্রণবানন্দ (১৮৯৬-১৯৪১), বিপ্লবী ফণিভূষণ মজুমদার (১৯০১-১৯৮১), স্টুয়ার্ড মুজিব (১৯৪০–১৯৭২) সহ অসংখ্য কীর্তিমান। মাদারিপুরের এই বিপ্লবী চারণক্ষেত্রের সাথেই কবির মনন ও চেতনার নিবিড় সংযোগ ঘটেছিল।
কৈশোরেই নজরুলের সাহিত্য ও সঙ্গীতের প্রতি অনুরাগ তৈরি হয়েছিল তাঁর দূরসম্পর্কের চাচা কাজী বজলে করিমের সান্নিধ্যে। ফার্সি ভাষায় পারদর্শী বজলে করিম নিজে গান লিখতেন, সুর দিতেন এবং গাইতে পারতেন। তাঁর কাছ থেকেই তরুণ নজরুলের কবিতা ও গানের হাতেখড়ি। ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি-মার্চে নজরুল যখন রানীগঞ্জের শিয়ারশোল রাজ হাইস্কুলে অষ্টম শ্রেণীতে ভর্তি হন, ঐ স্কুলের শিক্ষক নিবারণ চন্দ্র ঘটক (যুগান্তর বিপ্লবী) কবিকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। তিনি অতি সহজেই তরুণ নজরুলের মনে ব্রিটিশবিরোধী চেতনা তীব্র করে তোলেন এবং স্বাধীনতার পক্ষে লিখতে উদ্বুদ্ধ করেন—যেন তাঁর লেখা পড়ে সাধারণ মানুষ ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ ও জাগ্রত হয়ে ওঠে।
বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা-য় ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি নজরুলের প্রথম কবিতা ‘মুক্তি’ (ক্ষমা) এবং শেষের দিকে গল্প ‘হেনা’ প্রকাশিত হয়। একই সময়ে সওগাত পত্রিকায় তাঁর প্রথম প্রবন্ধ ‘তুর্ক মহিলার ঘোমটা খোলা’ ছাপা হয়। শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের ১২ জুলাই কমরেড মুজফ্ফর আহমদ (১৮৮৯-১৯৭৩) ও কাজী নজরুল ইসলামের যৌথ সম্পাদনায় ১ পয়সা মূল্যের সান্ধ্য পত্রিকা দৈনিক নবযুগ আত্মপ্রকাশ করে (পরবর্তীতে ব্রিটিশ সরকার এটি বন্ধ করে দেয়; ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে পুনরায় চালু হয়)।
হাফিজ মাসউদ আহমদের অর্থায়নে ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ১১ আগস্ট নজরুল প্রকাশ করেন অর্ধ-সাপ্তাহিক পত্রিকা ধূমকেতু। এই পত্রিকার ২৬ সেপ্টেম্বর সংখ্যায় ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা এবং লীলা মিত্রের ‘বিদ্রোহীর কৈফিয়ৎ’ প্রকাশের অপরাধে রাজদ্রোহের মামলায় ২৩ নভেম্বর কুমিল্লার ঝাউতলা মোড় থেকে নজরুলকে গ্রেপ্তার করা হয় (একই দিনে তাঁর যুগবাণী গ্রন্থটিও বাজেয়াপ্ত হয়)। ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের ৮ জানুয়ারি কলকাতার চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট সুইনহোর আদালতে বিচার চলাকালে কবি তাঁর কালজয়ী জবানবন্দী দেন, যা বাংলা সাহিত্যে ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ নামে বিখ্যাত। ১৬ জানুয়ারি এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের রায়ের পর ১৭ জানুয়ারি তাঁকে আলীপুর সেন্ট্রাল জেলে এবং ১৪ এপ্রিল হুগলী জেলে স্থানান্তর করা হয়। হুগলী জেলে রাজবন্দীদের ওপর অত্যাচারের প্রতিবাদে নজরুল টানা ৪০ দিন অনশন করেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস এবং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) তাঁর সমর্থনে এগিয়ে আসেন। দেশজুড়ে তীব্র প্রতিবাদের মুখে কারা-ব্যবস্থা সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেয় সরকার এবং পরবর্তীতে ২৩ মে কুমিল্লার বিরজাসুন্দরী দেবী হুগলী জেলে গিয়ে নিজ হাতে লেবুর রস পান করালে নজরুল অনশন ভঙ্গ করেন। এরপর ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের ১৮ জুন নজরুলকে বহরমপুর জেলে পাঠানো হয়।
বহরমপুর জেলে কবি নজরুলের সাথে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা ঘটে মাদারিপুরের বীর বিপ্লবী পূর্ণচন্দ্র দাস, কালীপদ রায়চৌধুরী, প্রফুল্ল চ্যাটার্জি, অমলেন্দু দাশগুপ্ত (১৯০৩-১৯৫৫) এবং সুভাষচন্দ্র বসুর অনুগামী নরেন্দ্রনারায়ণ চক্রবর্তী প্রমুখের সঙ্গে। ভালোবাসার গভীরতায় ও কারাবন্দী অবস্থায় গোপনে বিপ্লবী রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে পূর্ণচন্দ্র দাস হয়ে ওঠেন কবির নিকটতম সহযোদ্ধা; বস্তুত, এই প্রখ্যাত বিপ্লবীর সান্নিধ্যেই নজরুলের রাজনৈতিক ও বিপ্লবী চেতনার ভিত্তি সুদৃঢ় হয়েছিল। বহরমপুর জেলের সেলে পূর্ণচন্দ্র দাস ও নরেন্দ্রনারায়ণ চক্রবর্তীর পরামর্শেই মাদারিপুর শান্তিসেনা চারণদলের অভিনয়ের উদ্দেশ্যে নজরুল তাঁর জীবনের প্রথম নাটকটি রচনা করেন। মুজফ্ফর আহমদ তাঁর 'কাজী নজরুল ইসলাম : স্মৃতিকথা' গ্রন্থে এই প্রসঙ্গে স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন: ‘টি-পটটি তুলতেই দেখতে পেলাম যে একখানা পত্র চাপা আছে, নজরুলের পত্র। লিখেছে, আমার কথা সে সব শুনেছে। আমি কি বহরমপুরে বদলি হতে পারি না ? তারপরে লিখেছে তার সময় ভালই কাটছে। শ্রী পূর্ণচন্দ্র দাস (মাদারিপুরের) একখানা নাটক লিখে দেয়ার জন্য তাকে অনুরোধ করেছেন। তাই লিখছে সে তখন। শ্রী পূর্ণ দাস বাইরে গিয়ে একটি চারণদল গঠন করবেন। সেই চারণদলের অভিনয়ের উদ্দেশ্যে প্রয়োজন নাটকখানির। নজরুলের এই নাটক লিখিত হয়েছিল, তার পাণ্ডুলিপি জেল থেকে বাইরে নিরাপদে পৌঁছেও গিয়েছিল, কিন্তু তার পরে নাকি পাণ্ডুলিপিখানা হারিয়ে যায়। নজরুল ইসলামের একটা সৃষ্টি এইভাবে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।’ আর নরেন্দ্রনারায়ণ চক্রবর্তী ‘নজরুলের সঙ্গে কারাগারে’ শিরোনামে তাঁর জেলের ডায়েরিতে প্রসঙ্গত লিখে রেখেছেন: ‘আমার রোজনামচা: তারিখ ৩রা সেপ্টেম্বর, ১৯২৩। আজ সব স্থির হইয়া গেল। বাইরে যাইয়া আমরা- পূর্ণবাবু, কাজী ও আমি চারণদল গড়িয়া তুলিব। কাজী পালা গাঁথিবেন, গানে সুর দিবেন, গান গাহিবেন। আমার উপর থাকিবে অভিনয়ের দায়িত্ব। পরিচালনার ভার থাকিবে পূর্ণবাবুর উপর।’ দুর্ভাগ্যবশত সম্পূর্ণ নাটকটির পাণ্ডুলিপি হারিয়ে গেলেও, এর অন্তর্গত কালজয়ী গান ‘জাতের নামে বজ্জাতি’ রক্ষা পায়। গানটি ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের ২০ জুলাই বিজলী পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয় এবং গানটির পাদটীকায় লেখা হয়েছিল: ‘মাদারিপুর শান্তি-সেনা চারণ-দলের জন্য লিখিত অপ্রকাশিত নাটক থেকে।’ পরে এটি ১ আগস্ট ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত কবির বিষের বাঁশী কাব্যগ্রন্থে সংকলিত হয় (যা ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দের ২২ অক্টোবর ব্রিটিশ সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করে)।
১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে 'মাদারিপুর সমিতির' বিপ্লবী নেতা পূর্ণচন্দ্র দাস জেল থেকে মুক্তি পেলে তাঁকে শ্রদ্ধা ও সংবর্ধনা জানাতে নজরুল রচনা করেন বিখ্যাত কবিতা ও গান ‘পূর্ণ-অভিনন্দন’। এই কবিতায় কবি তাঁকে 'মাদারিপুরের মর্দবীর' বলে সম্বোধন করেন। নজরুল কবিতাটি লিখেছিলেন বহরমপুর জেলে বসে, পাঠিয়েছেন পাউরুটির ভেতরে ভরে, আর পঠিত হয়েছিল মাদারিপুরে বিপ্লবী পূর্ণচন্দ্র দাসের সংবর্ধনা সভায়। এই কবিতার কয়েকটি চরণ—
‘জয় বাংলার পূর্ণচন্দ্র, জয় জয় আদি-অন্তরীণ!
জয় যুগে-যুগে-আসা-সেনাপতি, জয় প্রাণ আদি-অন্তহীন!
স্বাগত ফরিদপুরের ফরিদ, মাদারিপুরের মর্দবীর,
বাংলা-মায়ের বুকের মানিক, মিলন পদ্মা-ভাগীরথীর!’
অধিকাংশ গবেষকের মতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান 'জয় বাংলা' এসেছে এই কবিতা থেকে। মুদ্রিত কবিতাটির পাদটীকায় লেখা হয়েছে: ‘মাদারিপুর শান্তি-সেনা-বাহিনীর প্রধান অধ্যক্ষ শ্রীযুক্ত পূর্ণচন্দ্র দাস মহাশয়ের কারামুক্তি উপলক্ষে রচিত।’ এই ঐতিহাসিক রচনাটি ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দের আগস্টে প্রকাশিত কবির ভাঙার গান কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়—যার মধ্যে আরেক কালজয়ী সৃষ্টি 'ভাঙার গান' শিরোনামে 'কারার ঐ লৌহ-কবাট' সংকলিত রয়েছে। তৎকালীন ঔপনিবেশিক সরকার একই বছরের ১১ নভেম্বর গ্রন্থটি বাজেয়াপ্ত ও নিষিদ্ধ করে। বহরমপুর জেল থেকে নজরুল মুক্তি পান ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের ১৫ ডিসেম্বর।
পরবর্তী বছরগুলোতে রাজনীতির ময়দানে কবির মাদারিপুর-প্রীতি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দের ১ মে ফরিদপুরের টেপাকোলা মাঠে অনুষ্ঠিত বেঙ্গল প্রোভিন্সিয়াল কংগ্রেস সম্মেলনে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের সভাপতিত্বে এবং মহাত্মা গান্ধী, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, সরোজিনী নাইডু ও মওলানা আবুল কালাম আজাদের উপস্থিতিতে কবি নজরুল যোগ দেন। পূর্ণচন্দ্র দাসের নেতৃত্বে মাদারিপুরের শান্তিসেনা বাহিনী সম্মেলনে যোগ দিলে কবির সাথে পুনরায় সাক্ষাৎ হয়। সম্মেলনে নজরুল তাঁর বিখ্যাত ‘চরকার গান’, ‘শিকল-পরা ছল’ ও ‘জাতের নামে বজ্জাতি’ গান পরিবেশন করেন। পল্লীকবি জসীম উদ্দীন ছাড়াও এই সম্মেলনে স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্ব পালন করেছেন মাদারিপুর শান্তিসেনা বাহিনীর সদস্য অনুকুল চ্যাটার্জি (ইন্দুদা), প্রিয়নাথ গাঙ্গুলী, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, জীবন মোল্লাসহ আরও অনেকে। মনোরঞ্জনের কণ্ঠে গান ও কবিতা আবৃত্তি শুনে তরুণ এই বিপ্লবীর প্রতি কবি নজরুলের বিশেষ দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। নজরুল-বন্ধু প্রাণতোষ চট্টোপাধ্যায় 'কাজী নজরুল' গ্রন্থে এই সম্মেলন প্রসঙ্গে লিখেছেন: ‘১৯২৫ সালে ফরিদপুরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলন হয়। সভাপতিত্ব করেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, বিপ্লবী নেতা পূর্ণ দাস তাঁর শাস্তিসেনা দল নিয়ে উপস্থিত। দক্ষিণপন্থী যদুপাল, নিবারণ পাল প্রভৃতি সম্মেলনের কর্তৃপক্ষ।........... তাঁর আগমনে ফরিদপুরের তরুণ সম্প্রদায় বিশেষ করে মুসলমান তরুণদের মধ্যে নূতনভাবে উৎসাহের ও প্রাণের সঞ্চার হয়। মাদারিপুরের ইস্কান্দার এম. এ. ও ল' পড়ছে; সে নজরুলকে তাঁর চরিত্রে মুগ্ধ করেছিল। এরা নজরুলের সংস্পর্শে দেশভক্ত হয়ে ওঠে। এদের মধ্যে নজরুল-ভক্ত বিপ্লবী জীবন মোল্লার কথা সর্বাগ্রে মনে পড়ে। জীবন মোল্লা বিপ্লবী দলের বিশ্বাসী সভ্য ছিলেন। তারপর ইনি বোমা প্রস্তুত করতে গিয়ে আহত হন, পরে যতদূর মনে পড়ে "চর মুগুরিয়া” ডাক লুট মামলায় আসামী হয়ে জেলও খাটেন। এ'র মত উদার ও আত্মভোলা যুবকর্মী কমই দেখা গেছে। নজরুল এঁকে যথেষ্ট স্নেহ করতেন।’ ইস্কান্দার আলী খান (১৯০১-১৯৮৩) পরবর্তীতে এমএলএ (১৯৫৪) হয়েছিলেন।
ভারতবর্ষের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে আলাদা ধ্যান-ধারণা থেকে ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বরে নজরুল, হেমন্তকুমার সরকার (১৮৯৭—১৯৫২), কুতুব-উদ্দিন আহমেদ ও শামসুদ্দীন হুসাইনকে সাথে নিয়ে গঠিত হয় 'লেবার স্বরাজ পার্টি অব দি ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস' (শ্রমিক-প্রজা স্বরাজ সম্প্রদায়)। নজরুল স্বহস্তে এই দলের ইশতেহার রচনা করেন এবং ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দের ১৬ ডিসেম্বর প্রকাশিত দলের মুখপত্র লাঙল পত্রিকার প্রধান পরিচালকের দায়িত্ব নেন (মণিভূষণ মুখোপাধ্যায় হয়েছিলেন সম্পাদক)।
১৯২৬ খ্রিস্টাব্দটি ছিল মাদারিপুরের ইতিহাসে নজরুলের প্রত্যক্ষ পদার্পণের এক স্মরণীয় অধ্যায়। ‘নিখিল বঙ্গীয় ও আসাম প্রদেশীয় মৎস্যজীবী সম্মিলন’ (১১-১২ মার্চ)-এর তৃতীয় অধিবেশনে যোগ দিতে সভাপতি হেমন্ত কুমার সরকার এবং কুমিল্লার বীর বিপ্লবী দম্পতি বসন্তকুমার মজুমদার (১৮৭৬–১৯৪৪) ও হেমপ্রভা মজুমদার (১৮৮৮-১৯৬২)-র সাথে স্টিমারযোগে কবি ১০ মার্চ সন্ধ্যায় প্রথমবারের মতো মাদারিপুরে আসেন। সেদিন তাঁকে স্বাগত জানাতে মাদারিপুর স্টিমার ঘাটে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ উপস্থিত হয়েছিলেন। কবিকে বহনকারী স্টিমারটি আড়িয়াল খাঁ নদীর তীরে যেখানে নোঙর করেছিল, সেই মাদারিপুর ঘাট ছিল তৎকালীন মাদারিপুর মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান মনমোহন সাহার বসতবাড়ি সংলগ্ন লক্ষ্মীগঞ্জ এলাকায়। তৎকালীন মাদারিপুর শহরের এই লক্ষ্মীগঞ্জেই মৎস্যজীবীদের তিনটি বড় 'টলঘর'-এ দু'দিনব্যাপী সম্মেলনের কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়। খরস্রোতা আড়িয়াল খাঁ নদীর ভয়াবহ ভাঙনে তৎকালীন কোর্ট-কাছারি, অফিস-আদালত, হাসপাতাল ও জেলখানাসহ মূল শহরের সেই ঐতিহাসিক স্থানটি ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে বিলীন হয়ে গেলেও, তার স্মৃতিচিহ্ন আজ 'পুরোনো মাদারিপুর' বা 'পুরোনো বাজার' নামে টিকে রয়েছে। এই ঐতিহাসিক সফরে কবি মোট তিন দিন (১০ থেকে ১৩ মার্চ) মাদারিপুরে অবস্থান করেছিলেন। সম্মিলন উপলক্ষে ৮ মার্চ কৃষ্ণনগরে বসে কবি রচনা করেন তাঁর বিখ্যাত ‘জেলেদের গান’ (ধীবরদের গান)। ১১ মার্চ সম্মিলনের উদ্বোধনী দিনে তিনি নিজ কণ্ঠে গানটি গেয়ে শোনান। গানটি ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দের ১৮ মার্চ লাঙল পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয় এবং গানটির পাদটীকায় লেখা হয়: ‘মাদারিপুরে নিখিল বঙ্গীয় ও আসাম প্রদেশীয় মৎসজীবী সম্মিলনীর তৃতীয় অধিবেশনের উদ্বোধন-সঙ্গীত।’ পরে এটি ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দের ২৫ অক্টোবরে প্রকাশিত কবির সর্বহারা কাব্যগ্রন্থে 'ধীবরদের গান' শিরোনামে অন্তর্ভুক্ত হয়। এই কাব্যগ্রন্থেই স্থান পেয়েছে কবির আরেক কালজয়ী অগ্নিঝরা গান 'কাণ্ডারী হুঁশিয়ার'। ১৮ মার্চ লাঙল পত্রিকায় ‘নিখিল বঙ্গীয় ও আসাম প্রদেশীয় মৎস্যজীবী সম্মিলন’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে অনুষ্ঠানটির বিবরণ দিতে গিয়ে উল্লেখ করা হয়েছিল: ‘গত ১১ই ও ১২ই মার্চ, ফরিদপুর জেলার মাদারিপুর শহরে মৎস্যজীবী সম্মিলনের তৃতীয় অধিবেশন হয়। ১০ই মার্চ সন্ধ্যায় সভাপতি শ্রীযুত হেমন্তকুমার সরকার মহাশয় স্টীমার যোগে আসেন। তাঁর সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলাম, শ্রীযুত বসন্তকুমার মজুমদার ও শ্রীমতী হেমপ্রভা মজুমদার ছিলেন। স্টীমার ঘাটে অভ্যর্থনার জন্য প্রায় ৫ হাজার লোক উপস্থিত হয়েছিলেন। সম্মিলনীতে বঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রায় ৫ শত প্রতিনিধি এসেছিলেন। সভায় শ্রোতার সংখ্যা ৫ হাজারের উপরে হয়েছিল। সভাপতি হেমন্ত বাবুর বক্তৃতা অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী এবং মৌলিক ধরনের হয়েছিল। কাজী সাহেবের গানে সকলেই মুগ্ধ হয়েছিলেন। অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি ডা. প্রতাপচন্দ্র গুহরায় ও সম্পাদক শ্রী কার্ত্তিকচন্দ্র মল্লবর্মণ মহাশয়ের বক্তৃতাও হৃদয়গ্রাহী হয়েছিল।’ মাদারিপুরের প্রতাপ চন্দ্র গুহরায় (১৮৮৭–১৯৮২) পরবর্তীতে পশ্চিমবঙ্গ আইন পরিষদের ডেপুটি চেয়ারম্যান (১৯৫২-১৯৬৫) হয়েছিলেন। জাতীয় জীবনের এই অনন্য অধ্যায়কে অমর করে রাখতে এবং নতুন প্রজন্মের কাছে কবি নজরুলের বিপ্লবী চেতনাকে পৌঁছে দিতে মাদারিপুরে একটি 'নজরুল স্মৃতিস্তম্ভ' স্থাপন এখন সময়ের দাবি।
সম্মেলন শেষে ১৩ মার্চ মাদারিপুরে অবস্থানকালে কুমিল্লার বিপ্লবী নেত্রী হেমপ্রভা মজুমদারকে নিয়ে কবি রচনা করেন ‘হেমপ্রভা’ কবিতাটি, যা ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দের জুলাইয়ে প্রকাশিত ফণি-মনসা কাব্যগ্রন্থে স্থান পায়। মুদ্রিত কবিতার পাদটীকায় উল্লেখ রয়েছে: ‘মাদারিপুর, ২৯শে ফাল্গুন, ১৩৩২’।
১৯২৬ খ্রিস্টাব্দের শেষভাগে কাজী নজরুল ইসলাম ভারতীয় কেন্দ্রীয় আইনসভার (সেন্ট্রাল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি) নির্বাচনে কংগ্রেস সমর্থিত স্বরাজ পার্টির প্রার্থী হিসেবে ঢাকা বিভাগ (যার অন্তর্ভুক্ত ছিল তৎকালীন বৃহত্তর ঢাকা, ফরিদপুর-মাদারিপুর, বাকেরগঞ্জ ও ময়মনসিংহ) থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এই নির্বাচনী প্রচারণার উদ্দেশ্যে কবি ঢাকা-ফরিদপুর অঞ্চল সফর করেন। এ সময় ফরায়েজী আন্দোলনের নেতা ও দুদু মিয়ার পৌত্র মাদারিপুরের পীর বাদশাহ মিয়া (আবা খালেদ রশীদ উদ্দিন আহমদ, ১৮৮৪–১৯৫৯) কবিকে সমর্থন জানিয়ে একটি ঐতিহাসিক ফতোয়া প্রদান করেছিলেন। জসীম উদ্দীন 'ঠাকুর বাড়ির আঙিনায়' গ্রন্থে লিখেছেন সেই নির্বাচনী স্মৃতিকথা: ‘একদিন গ্রীষ্মকালে হঠাৎ কবি আমার পদ্মাতীরের বাড়ি আসিয়া উপস্থিত। তিনি কেন্দ্রীয়-আইন সভার সভ্য হইবার জন্য দাঁড়াইয়াছেন। …কবি তখন তাঁর সুটকেস হইতে এক বাণ্ডিল কাগজ বাহির করিয়া আমার হাতে দিয়া বলিলেন, "এই দেখ, পীর বাদশা মিঞা আমাকে সমর্থন করে ফতোয়া দিয়েছেন। পূর্ববঙ্গের এত বড় বিখ্যাত পীর যা বলবেন, মুসলিম-সমাজ তা মাথা নিচু করে মেনে নেবে। জসীম, তুমি ভেবো না। নিশ্চয় সবাই আমাকে ভোট দেবে। ঢাকায় আমি শতকরা নিরানব্বই ভাগ ভোট পাব। তোমাদের ফরিদপুরের ভোট যদি আমি কিছু পাই, তা হলেই কেল্লা ফতে।’ ২৯ নভেম্বর ভোটের ফলাফল প্রকাশের পর দেখা গেল ১৮,১১৬ জন ভোটারের মধ্যে কবি ১০৬২ ভোট পেয়ে পাঁচজন প্রার্থীর মধ্যে ৪র্থ স্থান অর্জন করেন এবং জামানত বাজেয়াপ্ত হয় (টাঙ্গাইলের জমিদার আব্দুল হালিম গজনভী ও বাকেরগঞ্জ বামনার জমিদার মুহম্মদ ইসমাইল হোসেন চৌধুরী বিজয়ী হন)। নির্বাচনে নানা প্রতিকূলতার কারণে কবি জয়ী হতে না পারলেও সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ে তাঁর এই প্রচেষ্টা ছিল অভূতপূর্ব।
'বাংলার চিতোর' মাদারিপুরের বিপ্লবী চেতনার প্রতি কবি নজরুলের গভীর অনুরাগ ও শ্রদ্ধাবোধের চূড়ান্ত স্মারক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে তাঁর কাব্যগ্রন্থ সন্ধ্যা। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের ১২ আগস্ট প্রকাশিত এই বিখ্যাত গ্রন্থটি—যার মধ্যে বাংলাদেশের জাতীয় রণসংগীত ‘চল চল চল, ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল’ সংকলিত রয়েছে—কবি উৎসর্গ করেছিলেন মাদারিপুরের শান্তিসেনাদের উদ্দেশ্যে। উৎসর্গপত্রে লিখেছেন: ‘মাদারিপুর 'শান্তি-সেনা'র কর-শতদলে ও বীর সেনানায়কের শ্রীচরণাম্বুজে।’
এমনকি নজরুলের কথাসাহিত্যেও মাদারিপুরের ভৌগোলিক ও সামাজিক আবহ ধরা দিয়েছে। ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে সওগাত পত্রিকায় প্রকাশিত হয় নজরুলের গল্প ‘জিনের বাদশা’ (যা ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দের ১৬ অক্টোবর প্রকাশিত তাঁর ৩য় গল্পগ্রন্থ শিউলি মালা-য় অন্তর্ভুক্ত হয়)। গল্পের পটভূমিতে বর্ণিত মোহনপুর গ্রামটি ছিল মাদারিপুর অঞ্চলের পাশ দিয়ে প্রবাহিত আড়িয়াল খাঁ নদীর তীরে অবস্থিত। গল্পের শুরুতেই কবি লিখেছেন: ‘ফরিদপুর জেলায় ‘আরিয়ল খাঁ’ নদীর ধারে ছোট্ট গ্রাম। নাম মোহনপুর।’
১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবরে পুনরায় নবযুগ পত্রিকা বের হলে নজরুল এর সম্পাদক নিযুক্ত হন; সম্পাদকীয় বিভাগে অন্যান্যদের মধ্যে ছিলেন মাদারিপুরের দুই বিপ্লবী অমলেন্দু দাশগুপ্ত ও যোগীশ্বর কালীপদ গুহ রায় (১৯০২–১৯৬৬)। 'নবযুগ' দিয়েই নজরুলের সাংবাদিক জীবন শুরু হয়, আবার তাঁর সাংবাদিকতার পরিসমাপ্তি ঘটে ‘নবযুগেই’।
১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের ১০ অক্টোবর মাত্র ৪৩ বছর বয়সে কবি দুরারোগ্য ব্যাধিতে (পিক্স ডিজিজ) আক্রান্ত হয়ে বোধশক্তি ও বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন। এরপরও দেশে নজরুল-চর্চা জোরদার হয়; ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দের ২৪ মে ঢাকায় নজরুল একাডেমি গঠিত হয়।
১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে স্বাধীনতা অর্জনের পর ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের ২৪ মে স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে কবিকে স্বপরিবারে ঢাকায় নিয়ে আসা হয় এবং 'জাতীয় কবি' হিসেবে ঘোষণা করা হয় (যার আনুষ্ঠানিক গেজেট জারি করা হয় ২০২৪ খ্রিস্টাব্দের ১৫ ডিসেম্বর, যেখানে ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের ২৪ মে থেকেই কার্যকর ধরা হয়)। কবির জন্য ধানমন্ডির ২৮ নম্বর সড়কের ৩৩০-বি ভবনটি ('কবিভবন', বর্তমানে নজরুল ইনস্টিটিউট) বরাদ্দ দেওয়া হয়। ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডি.লিট ডিগ্রি দেয়। ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দের ১৮ ফেব্রুয়ারি কবিকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করা হয় এবং একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। একই বছর ‘চল চল চল’ গানটি রণসংগীতের মর্যাদা পায়।
১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দের ২৯ আগস্ট (১২ ভাদ্র ১৩৮৩ বঙ্গাব্দ) সকাল ১০টা ১০ মিনিটে ৭৭ বছর বয়সে ঢাকার পিজি হাসপাতালে কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ঐ দিনই বিকেল ৫:৩০ মিনিটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের পাশে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাধিস্থ করা হয়।
বাংলা সাহিত্যে 'বিদ্রোহী কবি' হিসেবে অমরত্ব লাভ করলেও তিনি ছিলেন একাধারে কবি, সংগীতজ্ঞ, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক, চলচ্চিত্রকার, গায়ক ও অভিনেতা। তাঁর জীবন কেবল সাহিত্যচর্চার গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি ছিলেন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের এক অনন্য রূপকার, চিন্তক ও প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। কবির অগ্নিঝরা কবিতা ও গান যুগে যুগে মানুষকে শোষণ-বঞ্চনা থেকে মুক্তির পথ দেখিয়েছে, যা ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের মহান মুক্তিযুদ্ধেও আমাদের জুগিয়েছে অবিরাম প্রেরণা। সর্বজনীন এই চেতনার বিকাশে মাদারিপুরের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। মাদারিপুরের বিপ্লবীদের রক্তঝরা সংগ্রাম, বীরত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সক্রিয়তা এবং এখানকার প্রকৃতির সান্নিধ্য কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও সাহিত্যকে চিরকালের জন্য মহিমান্বিত করে রেখেছে। সাম্য, মানবতা ও পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার যে বার্তা কবি ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন, তা মাদারিপুরের শান্তিসেনা ও বিপ্লবীদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই লাভ করেছিল দীপ্ত স্ফুলিঙ্গ। আর কবি নজরুলও তাঁর কালজয়ী সাহিত্যকর্মের মধ্য দিয়ে মাদারিপুরের সেই ঐতিহাসিক স্মৃতি ও স্বাক্ষরকে ধারণ করে রেখেছেন।
